নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল:
কোনো ধরনের নতুন কর বৃদ্ধি ছাড়াই ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৬৪৭ কোটি ৫৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৯ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি)।
নগর উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নারী ও শিশু কল্যাণ এবং ডিজিটাল নাগরিকসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার নগর ভবনে আয়োজিত বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিসিসির প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, সীমিত রাজস্ব আয়ের মধ্যেও নাগরিক সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কর বৃদ্ধি ছাড়াই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নারী ও শিশুবান্ধব স্মার্ট মহানগরী গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি জানান, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৫২০ কোটি ৮৬ লাখ ১৬ হাজার ৯২৮ টাকা। পরে সংশোধিত বাজেট দাঁড়ায় ৪৬২ কোটি ৮৬ লাখ ২২ হাজার ৮৩৭ টাকায়।
বাজেটে নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে জেলখাল, আমানতগঞ্জ, সাগরদী ও লাকুটিয়া খাল পুনঃখনন এবং খালের পাড় সংরক্ষণের জন্য ৭৬৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম তীরে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ৫৩৩ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
রূপাতলী সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ইতোমধ্যে চালু হয়েছে এবং বেলতলা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালুর প্রস্তুতি চলছে। ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় কীর্তনখোলা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের উন্নয়ন প্রকল্পও প্রস্তুত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। গত অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪টি নতুন পানির সংযোগ দেওয়া হয়েছে। নতুন পানির সংযোগের আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আগামী অর্থবছরে নগরীতে পানির এটিএম বুথ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন বর্জ্য অপসারণ করছে সিটি কর্পোরেশন। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করা হয়েছে।
এছাড়া চারটি ডাম্প ট্রাক, একটি মেডিকেল বর্জ্যবাহী কম্প্যাক্টর ট্রাক এবং একটি ভ্যাকুয়াম ট্রাক সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ঈদুল আজহায় সরকারি নির্ধারিত ১২ ঘণ্টার পরিবর্তে মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যেই কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে বলে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়।
বাজেটে নারীদের জন্য আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ মার্কেট, অসচ্ছল নারীদের আইনি সহায়তা এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণের উদ্যোগ রাখা হয়েছে।
শিশুদের জন্য গ্রীন সিটি পার্ক সংস্কার, নতুন রাইড স্থাপন, খেলাধুলার সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী অর্থবছরে ৫০ হাজার বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ফোয়ারা নির্মাণ, পার্ক উন্নয়ন, নগরীর আলোকসজ্জা বৃদ্ধি এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক মানচিত্রভিত্তিক ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
কর পরিশোধ, ট্রেড লাইসেন্স, ভবনের নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা ধাপে ধাপে অনলাইনে আনা হবে। এতে সেবার গতি বাড়বে এবং নাগরিক হয়রানি কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রশাসক।
প্রশাসক জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর ৪২ কিলোমিটার বিটুমিনাস কার্পেটিং সড়ক, ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার আরসিসি সড়ক, ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সিসি সড়ক এবং ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে।
এছাড়া নগরীর আলোকায়নে প্রায় ২৪ কোটি ৭৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে ১৬ হাজারের বেশি বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং ২০ হাজারের বেশি নতুন সড়কবাতি স্থাপন করা হবে।
গত অর্থবছরে ১০ হাজার ৪৭৯ জন নারী ও শিশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়েছে। হাম-রুবেলা কর্মসূচিতে ৪৩ হাজার ৮৫০ জন এবং ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইনে ৫৮ হাজার ৫৫৭ জন শিশু অংশ নেয়। আগামী অর্থবছর থেকে নগরীর তিনটি জোনে নারী ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া বরিশাল প্রেসক্লাব ও বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির ভবন সংস্কারের জন্যও বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতার শেষাংশে প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং অপচয় রোধের মাধ্যমে নাগরিক সেবার মান আরও উন্নত করা হবে। তিনি নগরবাসী, সাংবাদিক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, “কর বৃদ্ধি না করেও নগরবাসী আগের চেয়ে আরও উন্নত নাগরিক সুবিধা পাবেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও স্মার্ট বরিশাল গড়ে তুলতে চাই।”