ক্রাইমসিন ডেক্সঃ
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক যখন দীর্ঘ সময় ধরেই অবিশ্বাস, সীমান্ত সন্ত্রাস এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে আটকে রয়েছে, ঠিক তখনই তুলনামূলকভাবে সংযত এক অবস্থান সামনে আনল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে বলেছেন, পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভারতের আস্থা হারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তবুও কূটনৈতিক আলোচনার রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করা উচিত নয়।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দত্তাত্রেয় হোসাবলে বলেন, ‘যে কোনো দেশের নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান রক্ষার অধিকার রয়েছে। ভারত সেই জায়গা থেকে কঠোর অবস্থান নিতেই পারে।
কিন্তু একইসঙ্গে আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ রাখা উচিত নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।’
ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে আরএসএসকে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতাসীন মতাদর্শিক বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। ফলে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের এই মন্তব্যকে ঘিরে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি আরও প্রকট হয়েছে। সীমান্ত সন্ত্রাস, কাশ্মীর ইস্যু, জঙ্গি হামলা এবং কূটনৈতিক উত্তেজনার জেরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, ভিসা, সাংস্কৃতিক যোগাযোগসহ একাধিক ক্ষেত্র কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
গত বছর পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর নয়াদিল্লি ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেয়। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ সীমিত করা হয়, কমে যায় বাণিজ্যিক আদানপ্রদানও। পাশাপাশি নিরাপত্তা ইস্যুতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কড়া বার্তা দিতে থাকে ভারত সরকার।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আরএসএসের তরফে ‘আলোচনার রাস্তা খোলা রাখার’ বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। যদিও সংগঠনটি স্পষ্ট করেই জানিয়েছে, ভারতের নিরাপত্তা ও আত্মসম্মানের প্রশ্নে কোনও আপসের জায়গা নেই।
দত্তাত্রেয় হোসাবলে তার বক্তব্যে আরও বলেন, দুই দেশের চলমান অচলাবস্থা কাটাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ। তার মতে, সরকারিভাবে সম্পর্ক খারাপ থাকলেও সাধারণ মানুষের পর্যায়ে যোগাযোগ বজায় থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘সুশীল সমাজ, সংস্কৃতি এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক ভবিষ্যতে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে। কারণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে।’
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যে একদিকে যেমন কঠোর নিরাপত্তা অবস্থানের সমর্থন রয়েছে, তেমনই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংলাপের পথও পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, দুই দেশের সম্পর্কের যেকোনও পরিবর্তন আঞ্চলিক পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ইতিহাসে অতীতেও বহুবার দেখা গেছে, রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত দুই দেশকে কোনো না কোনো পর্যায়ে আলোচনায় ফিরতে হয়েছে। সেই বাস্তবতার প্রেক্ষিতেই আরএসএসের এই বক্তব্যকে অনেকেই ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবেও দেখছেন।
ব0র্তমানে নয়াদিল্লির আনুষ্ঠানিক অবস্থান কঠোরই রয়েছে। তবে আরএসএসের এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে— নিরাপত্তা প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান বজায় রেখেও ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখা কি ভারতের পরবর্তী কৌশলের অংশ হতে পারে?